প্রাক ইসলামী আরব
মানব ইতিহাসের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ দৃষ্টি উদ্ভব ঘটে দৃষ্টি হচ্ছে মানব জীবনের সামগ্রিক রূপরেখা। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কে মোকাবেলা করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এভাবেই প্রাচীন মিশরীয়রা নীলনদের উপত্যকায় ভূমি এবং জঙ্গলাকীর্ণ ভূ বাক্যে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে মিশরীয় সভ্যতার উদ্ভব ঘটায়।
এরই ধারাবাহিকতায় মেসোপটেমিয়া, সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, হিব্রু, গ্রীক, রোমান এবং পরবর্তীকালে আরব কেন্দ্রিক মুসলিম সভ্যতার উদ্ভব ঘটে।
প্রাচীন সভ্যতাগুলোর উদ্ভব ও বিকাশ সমাজবদ্ধ মানুষের উন্নত জীবনযাত্রার পরিচয় বহন করে। উপযুক্ত সভ্যতাগুলোর মধ্য ভারতীয় সভ্যতা একটি ব্যতিক্রমী।
এখানকার আবহাওয়া এবং রুক্ষ শুষ্ক ও প্রকৃতি অধিবাসীদের দেহ মন ও চরিত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করে। তাদেরকে কষ্টসহিষ্ণু ও পরিশ্রমী করে তোলে অপরদিকে গোত্রপ্রীতি কাব্যপ্রীতি এবং অতিথি প্রিয় তা তাদেরকে বিশিষ্টতা দান করেছে।
সামগ্রিকভাবে উক্ত সভ্যতা সমূহের বিভিন্ন জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মানুষ নদীভিত্তিক সভ্যতা থেকে সাগর-মহাসাগর এমনিকি মহাকাশীয় সভ্যতায় পদার্পণ করেছে।
ইসলামের জন্মভূমি আরব ভূখন্ড পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম উপদ্বীপ। এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত এই ভূখণ্ডের তিন দিকেই স্থল ভাগ দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় একে জাজিরাতুল আরব উপদ্বীপ বলা হয়ে থাকে।
এর উত্তরে সিরিয়ার মরুভূমির পূর্বদিকে আরব সাগর, পশ্চিমে লোহিত সাগর এবং দক্ষিনে আরব সাগর। ভারত মহাসাগর ভৌগলিক অবস্থান পর্যালোচনা প্রতীয়মান হয় যে আরও ভূমি এশিয়া ইউরোপ ও আফ্রিকার সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। প্রাচীন মানচিত্রে বিশ্বের কেন্দ্রস্থল হিসেবে আরব ভূখন্ডের অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরব শব্দটির উৎপত্তি বিষয়ক ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:-
(১) আরব শব্দটি আরবাতুন থেকে এসেছে যার অর্থ বৃক্ষলতা হীন মরুভূমি। যেহেতু অঞ্চলটি বৃক্ষলতা হীন এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
(২) হিব্রু শব্দ আবহার থেকে আরব শব্দটির উদ্ভব হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। আরবের বেশিরভাগ অঞ্চল মরুময় এ কারণে এরূপ নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয়।
(৩) আরব শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল বাগ্মিতা বা সুন্দর ভাষায় কথা বলা। প্রাচীন আরব বাসীরা বাগ্মিতাই পারদর্শী ছিল বলে অত্র অঞ্চলের নাম আরব হয়েছে মর্মে কেউ কেউ মত পোষণ করে থাকে।
প্রাক ইসলামী আরবের আয়তন ও লোকসংখ্যা
প্রাক ইসলামিক আরবের প্রাচীনকালে আয়তন ছিল ১০,২৭,০০০ বর্গমাইল (২৬,৫৮,৭৮১ বর্গ কিলোমিটার)। এই ভূখণ্ডে টি অতি প্রাচীন কালের সাহারা মরুভূমির অংশ ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে গোবি মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
আয়তনে এঅঞ্চলটি ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ ভূমধ্য সাগরের বিশাল জলরাশি আরব উপদ্বীপ কে মানুষের বসবাসের উপযোগী করেছে। এই উপদ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় 8 কোটি।
প্রাক ইসলামিক আরবের মরু অঞ্চল:
মরু অঞ্চল গুলো একেবারে অনুর ভর এবং বসবাসের অনুপযোগী। মাঝে মাঝে বিষাক্ত লুহ হাওয়া প্রবাহিত হয়। তবে কখনো কখনো সামান্য বৃষ্টিপাতে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।
এর ফলে কিছুদিনের জন্য এসব অঞ্চলে বসবাস করে। পাহাড় ও মালভূমি ছাড়া আরবের বাকি অঞ্চল মরুময়। আরবের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মরু অঞ্চলের অনুসরে এ অংশটি তিনভাবে বিভক্ত সাদা ও লাল চেলি যুক্ত।
আরবের উত্তর অঞ্চল নামে পরিচিত উত্তরে দক্ষিণে এবং পূর্বে ওমান হতে পশ্চিমে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল হচ্ছে আল দাহনা। এটি আরবের বৃহত্তম মরুভূমি দক্ষিণভাগ আরব আল খালিফা জনশূন্য অঞ্চল নামে পরিচিত।
আরবের মানচিত্রে আল জাহান কে সাধারণত আল খালি অঞ্চল হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এছাড়া অসমতল লাভা আচ্ছাদিত ফাটল যুক্ত আগ্নেয়গিরি অঞ্চলকে বলা হয় আল হাররাহ।
আরব দেশের ভূগঠন হতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে প্রাচীনকালে ভুমধ্যসাগরের উপদ্বীপকে বসবাসযোগ্য করে তোলে।
প্রাক ইসলামিক আরবের পাহাড়ি অঞ্চল:
আরব উপদ্বীপ কি পশ্চিম প্রান্ত হতে পূর্ব দিকে ক্রমশ ঢালু এর পূর্বদিকে অবস্থিত 9000 ফুট উঁচু ওমান পর্বতমালা। দক্ষিণাঞ্চলের অঞ্চলকে তিহামা বলা হয়ে থাকে।
উত্তর দিকের একটি উচ্চ মালভূমি। এর গড় উচ্চতা প্রায় 2500 ফুট। পশ্চিম দিকে লোহিত সাগরের তীর বেপি উত্তর-দক্ষিণ বরাবর একটানা পর্বতমালাকে আরবের মেরুদন্ড বলা হয়।
ইয়েমেন প্রদেশের উঁচু পর্বত শ্রেণীর জাবাল আল ইয়েমেন আল্পস পর্বতের মাউন্ট ব্ল্যাক সের সমান উচ্চতা বিশিষ্ট।
প্রাক ইসলামিক আরবের উর্বর অঞ্চল:
মরু ও পার্বত্য অঞ্চল ব্যতীত আরবের উর্বর তৃণমূল কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে নজদ, হেজাজ, ইয়েমেন , হাজরামাউত, এবং ওমান।
এগুলোর মধ্যে তেজাজি হলো ইসলামের কেন্দ্রভূমি। মধ্য আরবের হেলাস কোন দেশের তিনটি বিখ্যাত শহর মক্কা-মদিনা ও তায়েফ। এগুলো শস্য-শ্যামল হওয়ায় মানুষের বসবাস উপযোগী।
অপরদিকে ইয়েমেন ওমান এবং হাজরামাউত দক্ষিণ ভারতে অবস্থিত এবং ঘনবসতিপূর্ণ এবং ব্যবসায়-বাণিজ্য কৃষিকাজের জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলের মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করে।
ইয়েমেন শব্দের অর্থ নামকরণ থেকে দক্ষিণ আরবের নামকরণ হয়েছে। সুখে আরব ভূমি বা সৌভাগ্য আরো সমৃদ্ধ এবং সুগন্ধি দ্রব্য ভরপুর দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রাক ইসলামী আরবের আবহাওয়া:
আরবের আবহাওয়া অত্যন্ত শুষ্ক। এ ভূভাগের হিনদিগজল বৈশিষ্ট্য হলেও অত্যন্ত অভ্যন্তরে নৌ চলাচলের উপযোগী। মরুভূমির বৃষ্টির পানিতে কখনো ঝর্ণার সৃষ্টি হয় এই ঝর্ণাধারা কে বলা হয় ওয়াদি।
বেদুইনদের কাফেলার জন্য এই ওয়াজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমী বায়ুর আওতাভুক্ত হলে এই উপদ্বীপের জলবায়ু আর্দ্র হতে পারতো। তবে দক্ষিণ সমুদ্র হতে কখনো জলবাহী মেঘ ওঠে কিন্তু মরুভূমির ঝড় সাইমুম এই মেঘ থেকে জল শুষে নেয়।
ফলে মেঘ যখন আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে তখন তাতে আর জলীয়বাষ্প অবশিষ্ট থাকে না। তবে ইয়েমেন ও মানহাজ প্রভৃতি উপকূলীয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে এবং উপত্যকায় কখনো কখনো সামান্য বৃষ্টিপাত হয়।
প্রাক ইসলামিক আরবের জীবজন্তু:
আরব উপদ্বীপে বিচিত্র ধরনের জীবজন্তু পশুপাখি সন্ধান পাওয়া যায়। জীবজন্তুর মধ্য চিতা, নেকেড, খেকশিয়াল, গিরগিটি, হায়েনা ও সাপ এগুলো রয়েছে।
শিকারি পাখির মধ্য ঈগল, বাজপাখি এবং পেঁচা অন্যতম। এই পাখিগুলো ছাড়াও হুদহুদ, নাইটিঙ্গেল, বুলবুল, পায়রা, কাক এবং তিতির পাখি দেখা যায়।
গৃহপালিত পশুদের মধ্যে উট, ঘোড়া, গাধা কুকুর বিড়াল ভেড়া ও ছাগল ছিল অন্যতম। আরবের ঘোড়াগুলো বিশ্ব বিখ্যাত। ঐতিহাসিক হিট্টির মতেই আরবি ওরা সিরিয়া থেকে ঘোড়া আমদানি করে।
প্রাক ইসলামিক আরবের মরুভূমির জাহাজ:
জীবজন্তুর মধ্য উট ছিল আরববাসীদের নিকট অত্যন্ত মূল্যবান। আরবদের জীবনের একমাত্র সহায় ছিল। উটের মাংস তাদের প্রিয় খাদ্য। উটের চামড়া দিয়ে তারা পোশাক পরিষদ তৈরি করত।
উটের মল জ্বালানি এবং চুলার টনিক রূপে ব্যবহার করা হতো। যুদ্ধক্ষেত্র উট ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। উদ্ভিদের নিত্য সহ সড়কপথের বন্ধু আরবে নৌ চলাচলের উপযোগী কোন নদী না থাকায় ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রধান বাহন ছিল উট।
উত্তপ্ত মরুভূমিতে উট ছিল আরবের যাতায়াতের একমাত্র বাহন। আদান প্রদানের মাধ্যম শীতকালে 25 দিন এবং গরমের সময় 5 দিন পানি পান না করে উট থাকতে পারে তাই উটকে মরুভূমির জাহাজ বলা হতো।
সম্পর্কে বলা হয়েছে তারা কি দেখে না উটকে কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। উটের মাধ্যমে আরববাসীদের সম্পদের হিসাব করা হতো ।এছাড়া রক্তপণ ও যৌতুকের টাকা পরিশোধের ইটের বিকল্প ছিল না।
প্রাক ইসলামিক আরবের প্রাকৃতিক সম্পদ:
প্রাচীনকালে আরবের প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সোনা, গ্রানাইট, ব্যাসটল,লবণ, মুক্তা এবং চুনাপাথর। আধুনিককালে আরব দেশে প্রচুর তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়েছে যা আরবেরা এর প্রধান উৎস।
প্রাক ইসলামিক আরবের জাতিসমূহ:
আরব উপদ্বীপের প্রাচীন অধিবাসী সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। আরবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আরব দেশে বিভিন্ন জাতির লোক বসতি স্থাপন করেছিল। আরব জাতি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত।
(১) আরব বায়দা।
(২) আরব বাকিয়া।
আদ, সামুদ, তামস, জাদীস প্রভৃতি প্রাচীন গোত্রগুলো বাইদা শ্রেণীভূক্ত ছিল। উক্ত জাতিগুলোর ধ্বংসপ্রাপ্ত হাওয়ায় বায়দা গোত্রগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাকিয়া জাতি বর্তমান আরব ভূখন্ডের প্রধান অধিবাসী এদের কে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়।
(১) আরব আল-আরাবিয়া বা প্রকৃত আরব।
(২) আরব আল মুস্তারিবা।
দক্ষিণ আরবের অধিবাসীগণ তাদের কল্পিত পূর্বপুরুষ ইয়ারাব ইবনে কাহতানের এর বংশধর বলে দাবি করেন।
প্রাক ইসলামী যুগে আরবের সাংস্কৃতিক অবস্থা:
ইসলামের অভ্যুদয় এর পূর্বে আরবে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতিতে পণ্য ও মার্জিত কথা গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি মক্কা-মদিনা ও শহরবাসীরা ছাড়া আরও প্রায় সকলেই ছিল তাদের সাংস্কৃতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় ।
উন্নত ভাষা সৃজনশীল দক্ষতা ও প্রখর শক্তির অধিকারী
জাহেলী যুগে আরবের শিক্ষা ও সংস্কৃতি না থাকলেও তাদের একটি উন্নত ভাষা ছিল। এজন্য তারা নিজেদেরকে আরো বড় মার্জিত পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও সুন্দর ভাষায় কথা বলে উল্লেখ করত।
তারা অসাধারণ সিজনশীল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। গীতিকাব্য রচনা তার পরিচয় প্রদান করে। তাদের স্মৃতিশক্তি ছিল খুবই প্রখর। তারা স্মৃতিশক্তি বলে প্রায় এক লক্ষের অধিক কবিতা স্মরণে রাখতে পারতো।
সাহিত্যচর্চা
আরবরা সাহিত্যচর্চায় ছিল খুবই উন্নত। পৃথিবীতে সম্ভবত অন্য কোন জাতি আরবদের নয় সাহিত্যচর্চায় এত বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেন না। প্রাচীন আরবি সাহিত্য তারই প্রমাণ বহন করে তখন সাহিত্য ছিল প্রধান তো কাব্য সাহিত্য।
প্রবাদ বাক্য, গীতিকাব্য, সাহিত্য আসর এর ব্যবস্থা, জ্যোতিবিদ্যা ও চিকিৎসা বিদ্যা ।
উকায মেলা:
আরব সাংস্কৃতিক জীবনের উকাজ মেলা ছিল বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার প্রতিবছর মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী স্থানে এই মেলা বসতো। এখানে কাব্য প্রবাদ বীরত্ব ও বাগ্মিতার প্রতিযোগিতা হত এবং শ্রেষ্ঠদের পুরস্কৃত করা হতো।
এখানে গান-বাজনা নৃত্য জুয়া লটারি প্রভৃতির আসর বসতো। উকাজ মেলা কি প্রাচীন আরবের academic francais বলে অভিহিত করা হতো।